স্টাফ রিপোর্ট।। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশ যে কোনো দেশের
সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে। এখন আমাদের
আর কেউই পেছনে টেনে নিতে পারবে না।
তিনি বলেন,
‘জিয়াউর
রহমানের জন্ম বিহারে, এরশাদের
(হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ) জন্ম কুচবিহারে, খালেদা জিয়ার জন্ম শিলিগুড়িতে। একজনও এ মাটির সন্তান না। এই
মাটির সন্তান এখন পর্যন্ত যতজন ক্ষমতায় এসেছেন, একমাত্র আমার বাবা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু এবং আমি শেখ হাসিনা
বাংলাদেশের মাটির সন্তান। যেহেতু আমাদের মাটির টান আছে, এজন্য আমাদের একটা
কর্তব্যবোধ আছে।’
প্রধানমন্ত্রী মঙ্গলবার রাতে রোমের পার্কে দ্য প্রিনসিপি
গ্রান্ড হোটেল অ্যান্ড স্পা’তে
আওয়ামী লীগের ইতালি শাখা আয়োজিত সংবর্ধনায় এক ভাষণে এ কথা বলেন।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী বুধবার সকালে বাংলাদেশ দূতাবাসের
চ্যান্সেরি ভবনের উদ্বোধন করেছেন। ইতালির রাজধানী রোমের ভিয়া ডেল অ্যান্ট্রাটাইডে ২৩
দশমিক ৯ কাঠার ওপর ৫ তলা ভবনের উদ্বোধন করেন। প্রধানমন্ত্রীর ছোট বোন শেখ রেহানা ও
মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুল উপস্থিত ছিলেন।
যুগান্তরের ইতালি প্রতিনিধি জামির হোসেন, সংবাদ সংস্থা বাসস ও
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এ তথ্য জানিয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকের বুলেটে
বাবা-মাসহ পরিবারের প্রায় সব সদস্যকে হারানোর কথা স্মরণ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ‘জীবনের সবকিছু ত্যাগ করে
একটা কাজই করে যাচ্ছি, বাংলাদেশের
মানুষের ভাগ্যটা পরিবর্তন করতেই হবে। সেই কথা চিন্তা করে আমরা প্রত্যেকটা পদক্ষেপ
নিচ্ছি।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন, আওয়ামী লীগের ইতালি
শাখার সভাপতি মোহাম্মাদ ইদ্রিস ফারাজি ও সাধারণ সম্পাদক হাসান ইকবাল এবং প্রবাসী
বাংলাদেশিদের পক্ষে হোসনে আরা বেগম বক্তৃতা করেন। ইতালিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত
আবদুস সোবহান সিকদার এবং যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সভাপতি সুলতান মাহমুদ শরিফ মঞ্চে
উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যাতে প্রত্যেক উপজেলা থেকে এক হাজার জনকে বিদেশে পাঠাতে
পারি সেজন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছি,
আমরা
তাদের জন্য স্মার্ট কার্ড দিচ্ছি।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘এখন ই-পাসপোর্টের যুগ চলছে এবং আমরা ইতিমধ্যেই এ পাসপোর্ট
প্রদানের কর্মসূচি শুরু করেছি;
যাতে
কেউ জালিয়াতির শিকার না হন।’
শেখ
হাসিনা অনুষ্ঠানে বলেন,
‘আমরা
আমাদের উন্নয়ন প্রকল্পের শতকরা ৯০ ভাগ নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করছি। এখন আর
দাতারা আমাদের ভিক্ষা দিতে আসে না। বরং তারা আমাদের উন্নয়ন সহযোগী অভিহিত করে
সহযোগিতা দিতে আসে। কারণ কারও কাছে আমরা ভিক্ষা চাই না।’
নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রসঙ্গ টেনে
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যে
কোনো কাজ যে আমরাই পারি,
তা
প্রমাণ করতে সমর্থ হয়েছি।’
পদ্মা
সেতুকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাংক সরকারকে বদনাম দিতে চেয়েছিল উল্লেখ করে শেখ হাসিনা
বলেন, ‘আমি
এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করি যে, আমরা নিজস্ব অর্থায়নেই এ সেতু নির্মাণ করব এবং এখন প্রকল্পটি
বাস্তবায়ন করছি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতির পিতার নেতৃত্বে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীনতা
অর্জন করেছে; কাজেই
আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যখনই আমরা ক্ষমতায় আসি না কেন আমরা দেশটাকে এমনভাবে গড়ে
তুলব, যাতে
বিশ্বসভায় বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে চলতে পারে।’
অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতির
পিতা যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে গড়ে তুলে স্বল্পোন্নত দেশের পর্যায়ে রেখে যান। আমাদের
সরকার দেশকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে এবং ২০২৪ সাল পর্যন্ত
আমাদের এ অবস্থান ধরে রাখতে হবে- তাহলেই আমরা মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে পারব। এ
লক্ষ্য অর্জনের জন্য যে তিনটি মাপকাঠি রয়েছে তা আমরা ইতিমধ্যেই অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৭৫ সালে জাতির পিতাকে হত্যার পর যারাই ক্ষমতায় এসেছিল তারা
নিজেদের ভাগ্যবদলে ব্যস্ত ছিল,
জনগণের
জন্য কিছু করে নাই। তার সরকার অতি দরিদ্রের হার শতকরা ১০ শতাংশে এবং দারিদ্র্যের
হার ২০ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। ইনশাআল্লাহ আমরা এ বছরের মধ্যে এই হারকে আরও ২
থেকে ৩ ভাগ নামিয়ে আনতে সক্ষম হব,
যেজন্য
আমরা বেশকিছু বিশেষ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি।’
‘মুজিববর্ষে
একটি লোকও গৃহহীন থাকবে না’-
উল্লেখ
করে তিনি বলেন, নদী
ভাঙন কবলিত জনগণের পুনর্বাসনের জন্য বাজেটে পৃথকভাবে একশ’ কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা
হয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের কল্যাণে তার সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা
উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন,
সরকার
প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছে, যাতে বিদেশ গমনেচ্ছুদের এজন্য ঘরবাড়ি ভিটেমাটি বিক্রি করতে না
হয়। ‘বিমানবন্দরে
কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয়’
সেজন্যই
এ ব্যবস্থা উল্লেখ করে তিনি বলেন,
‘আমরা
আরও উন্নত যাত্রীসেবা প্রদানের জন্য হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের
তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ করছি।’
গত ১১ বছরে দেশের চমকপ্রদ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রসঙ্গ টেনে
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর
পেছনে কোন জাদু নেই। তিনি বলেন,
‘এজন্য
দেশকে ভালোভাবে জানা এবং আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের প্রয়োজন, জনগণকে ভালোবাসা এবং
তাদের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস রাখা এবং তাদের কল্যাণে কাজ করার প্রয়োজন, যা আমাদের বাবা-মা
আমাদের শিখিয়েছেন।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘অনেক কাজ বাকি এবং আমরা যে সময় পাব আমি তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার
করে দেশকে দ্রুত উন্নত করার চেষ্টা করব এবং এজন্য সবার সহযোগিতা কামনা করছি।’
বিমানের ফ্লাইট চালুর বিষয়ে ইতালি প্রবাসীদের দাবির
পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন,
‘এ
বিষয়ে ইতালি সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলছে। আমি ইতালির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে
আমাদের বৈঠকেও বিষয়টি উত্থাপন করব।’
ইতালির
প্রধানমন্ত্রী জিওসিপ্পে কাঁতে’র
আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চার দিনের সরকারি সফরে মঙ্গলবার বিকালে এখানে
এসেছেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতালির রাজধানী রোমে নতুন চ্যান্সেরি
ভবন উদ্বোধনের পর ভবনের ভেতরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ
করে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
উদ্বোধনের সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেন, রোমে বাংলাদেশের
রাষ্ট্রদূত আবদুস সোবহান,
প্রধানমন্ত্রীর
মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস,
পররাষ্ট্র
সচিব মাসুদ বিন মোমেন, প্রধানমন্ত্রীর
প্রেস সচিব ইহ্সানুল করিম উপস্থিত ছিলেন।
পরে প্রধানমন্ত্রী চ্যান্সেরি ভবন ঘুরে দেখেন। কর্মকর্তাদের
সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন,
তার
সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর যেসব দেশে বেশি বাংলাদেশি বসবাস করছে সেসব দেশে নিজস্ব
চ্যান্সেরি ভবন এবং দূতাবাস নির্মাণের পদক্ষেপ নিয়েছে।
তিনি বলেন,
‘আমি
আজ খুব আনন্দিত। ইউরোপে ব্রিটেনের পরে এখানেই সর্বাধিক সংখ্যক বাংলাদেশি বসবাস
করছেন।’ শেখ
হাসিনা বলেন, বর্তমান
পৃথিবীতে বিশ্ব একটি গ্রামে পরিণত হয়েছে, যেখানে কেউ একা একা চলতে পারে না।
তিনি বলেন,
‘তাই, আমরা বিভিন্ন দেশে
আমাদের নিজস্ব চ্যান্সেরি ভবন এবং দূতাবাস ভবন নির্মাণ করছি। এটি আমাদের জন্য
গর্বের বিষয়, কারণ
সেখানে আমাদের পতাকা উড়বে এবং সেসব দেশের মানুষ বাংলাদেশ সম্পর্কে আরও জানতে পারবে।
প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন যে,
জাতির
পিতা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠনের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের নিজস্ব
দূতাবাস ভবন নির্মাণের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এ সময় প্রধানমন্ত্রীকে চ্যান্সেরি ভবনের
বিভিন্ন দিক সম্পর্কে অবহিত করেন। প্রধানমন্ত্রী চ্যান্সেরি ভবনে পৌঁছে প্রথমে
ভাষা আন্দোলনের শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে দূতাবাস প্রাঙ্গণে স্থাপন করা শহীদ মিনারে
পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
খবর বিভাগঃ
জাতীয়

0 facebook: