স্টাফ রিপোর্ট।। করোনাভাইরাসের
প্রভাবে প্রতিদিনই ক্রয়াদেশ হারাচ্ছে গার্মেন্ট মালিকরা, নতুন অর্ডারও আসছে না।
চব্বিশ ঘণ্টায় ১০ কোটি ডলারের অর্ডার বাতিল হয়েছে।
এ রকম মহাসংকটের মুখে গার্মেন্ট বন্ধ ঘোষণা করা হবে কিনা সে
বিষয়ে বিজিএমইএ
এখনও নিশ্চুপ। গভীর এই সংকটে নানা রকম ক্ষতির বিষয় মাথায় নিয়ে গার্মেন্ট চালু রাখার
প্রশ্নে অনেক উদ্যোক্তাই সংক্ষুব্ধ। কেননা রফতানি অর্ডারের সঙ্গে উৎপাদনের সম্পর্ক এবং উৎপাদনের
সঙ্গে শ্রমিক কর্মচারীর
কাজের মজুরি প্রদানের বিষয়টি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাই বেশির ভাগ গার্মেন্ট মালিক তৈরি
পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) নেতৃবৃন্দের কাছে এ বিষয়ে দ্রুত সমাধান চান। কিন্তু বুধবারও
কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।
শীর্ষ স্থানীয় গার্মেন্ট মালিকদের কয়েকজন যুগান্তরকে বলেন, এমনিতে প্রায় সময় মজুরি ইস্যুতে
শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে অবরোধসহ সহিংস বিক্ষোভে জড়িয়ে পড়েন। উপরন্তু, সাম্প্রতিক সময়ে নানা
কারণে দেশের শিল্প মালিকরা ভালো
অবস্থানে
নেই।
এখন আবার ভয়াবহ করোনাভাইরাসের প্রভাবে সারা বিশ্ব ‘লক ডাউন’ অবস্থার দিকে যাচ্ছে। ফলে সৃষ্ট
আর্থিক সংকটের কারণে গার্মেন্ট মালিকদের অনেকে সময়মতো মজুরি পরিশোধ করতে পারবেন কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ
আছে। এ
অবস্থায় অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগেই এ বিষয়ে বিজিএমইএ-কে সময়োপযোগী
সিদ্ধান্তে আসতে হবে। তারা বলেন,
যথাসময়ে
বিজিএমইএ সঠিক
সিদ্ধান্ত দিতে ব্যর্থ হলে যে কোনো উদ্ভূত পরিস্থিতির দায় তাদের ঘাড়েই বর্তাবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক বুধবার রাতে যুগান্তরকে বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে গত
২৪ ঘণ্টায় ৯৪ কারখানা ১০ কোটি ৪০
লাখ
ডলারের ক্রয়াদেশ হারিয়েছে।
এ
অবস্থায় গার্মেন্ট মালিকরা কী কী নীতিসহায়তা পেতে পারে সে বিষয়ে গত কয়েকদিন থেকে সরকারের
সঙ্গে আলোচনা চলছে।’ এক
প্রশ্নের জবাবে রুবানা হক
বলেন, ‘গার্মেন্ট বন্ধের প্রশ্ন
আসছে কেন? এখনও
তো করোনা ভাইরাস মহামারী
আকার
ধারণ করেনি।
কম্বোডিয়া,
মিয়ানমার, ভিয়েতনামসহ অনেক দেশ এমন
সিদ্ধান্ত নেয়নি। তাহলে
আমাদের
এখানে এ ধরনের প্রশ্ন আসা একেবারে অবান্তর এবং এটি দেশের স্বার্থবিরোধী কথা।
বরং আমরা চেষ্টা করছি, যাতে অর্ডার বাতিল না হয়। যারা বাতিল করছেন তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করছি।
কারণ এই পরিস্থিতি তো সাময়িক।’
তিনি
বলেন, ‘সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আমরা আমাদের
মতো করে সমাধানের চেষ্টা করছি।
মনে রাখতে হবে,
এখানে
দেশের অনেক বড় স্বার্থ জড়িত। এর সঙ্গে বহু মানুষের কর্মসংস্থানের বিষয় রয়েছে। হুট করে কোনো কিছু করা বা বলা মোটেই
সমীচীন হবে না।’
শ্রম সচিব কেএম আলী আজম যুগান্তরকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত গার্মেন্ট
বন্ধ রাখার
বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে আসেনি। আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) বাণিজ্য
সচিবের সঙ্গে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা হবে। এরপর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’
গার্মেন্ট মালিকদের অনেকে বুধবার যুগান্তরকে বলেন, করোনাভাইরাসের প্রভাবে মহাসংকটে পড়েছে
তৈরি পোশাক খাত। একদিকে ক্রেতারা নতুন অর্ডার দিচ্ছে না,
পুরনো
অর্ডারেও কাটছাঁট করছে। আবার অনেক ক্রেতা কারখানায় উৎপাদিত পণ্য জাহাজীকরণ করা থেকে বিরত থাকতে বলেছে। কারণ বিদেশি ক্রেতা ও
তাদের ব্রান্ডগুলো ইতিমধ্যেই বিভিন্ন দেশে বিক্রয় কেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে। এ অবস্থায় কারখানা চালু রাখলে
ইউটিলিটি বিল (গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি) এবং
শ্রমিকদের বেতন দিতে হবে। আগে যেসব পণ্যের শিপমেন্ট করা হয়েছে, সেই রফতানি বিলও পাওয়া যায়নি।
এ পরিস্থিতিতে কারখানা খোলা রাখলে অনেকের জন্য শ্রমিকদের বেতন
দেয়া কষ্টসাধ্য
হয়ে পড়বে। আবার বন্ধ করে দিলে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেবে। সব মিলিয়ে চতুর্মুখী চাপে
আছেন গার্মেন্ট মালিকরা।
তারা বলেন,
কোনো
গার্মেন্ট মালিকই এ শিল্পের সামান্য ক্ষতি দেখতে চান না। বিশেষ করে সততা ও
নিষ্ঠার সঙ্গে ব্যবসা করে দেশের যেসব শীর্ষস্থানীয় গার্মেন্ট মালিকরা তিল তিল করে এই সেক্টরকে আজ মহীরুহুতে পরিণত
করেছেন তাদের
কাছে প্রতিটি গার্মেন্ট কারখানা সন্তানের মতো।
কিন্তু তাদের মতে, এটিও সত্য যে- ব্যবসার স্বাভাবিক গতি বহাল না থাকলে সেটি বেশিদিন লোকসান কিংবা
ক্ষতিপূরণ দিয়ে চালানো সম্ভব নয়। সেজন্য করোনাভাইরাসের এই পরিস্থিতিতে সবার আগে সরকারকে বড় ধরনের নীতি
সহায়তা নিয়ে এগিয়ে
আসতে হবে।
এফবিসিসিআইর সহ-সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, এভাবে চলতে থাকলে করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী
মহামারীতে পরিণত হবে। তখন গার্মেন্ট খাতের অবস্থা আরও শোচনীয় হয়ে পড়তে পারে। আগামী শুক্রবার পর্যন্ত ইউরোপের
বাজার খোলা থাকবে।
সেখান থেকে কী জানানো হয় তার ভিত্তিতে রোববার বা সোমবার সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে
পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
অনেক গার্মেন্ট মালিক বলছেন, দ্রুত সিদ্ধান্ত না দিলে পরবর্তীতে শ্রমিক অসন্তোষের মতো ঘটনা ঘটলে
এর দায় বিজিএমইএ’র
বর্তমান নেতৃত্ব নিতে হবে। কারণ
বিজিএমইএ
সিদ্ধান্ত না দিলে কোনো গার্মেন্ট মালিকের একার পক্ষে কারখানা বন্ধের ঘোষণা দেয়া সম্ভব
না।
এতে সবদিক থেকে ওই মালিককে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে। রফতানি উন্নয়ন
ব্যুরোর (ইপিবি)
হালনাগাদ তথ্যমতে, ২০১৯-২০
অর্থবছরে ৮ মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) তৈরি পোশাক খাতের রফতানি আয় কমেছে। অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি শেষে
পোশাক রফতানি করে
বাংলাদেশ আয় করেছে ২ হাজার ১৮৪ কোটি ৭৪ লাখ ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ কম।
একই সময়ে রফতানি প্রবৃদ্ধিও কমেছে ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের
বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র,
জার্মানি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডায় ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে
পড়েছে করোনাভাইরাস। যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, ফ্রান্স ও ইতালিতে জরুরি
অবস্থা জারি করা হয়েছে।
দেশগুলোতে
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ছাড়া অন্য সব দোকানপাট ও প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। গ্যাপ, নাইকি, ইন্ডিটেক্সের মতো
বিশ্বখ্যাত ব্রান্ডগুলো ঘোষণা দিয়ে
বিভিন্ন
দেশে তাদের বিক্রয় কেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে।
সম্প্রতি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এক প্রতিবেদনে বলেছে, করোনাভাইরাসের প্রভাবে
বাংলাদেশের অর্থনীতির সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার বা ২৫ হাজার ৬শ’ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এটি বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) শূন্য দশমিক ১
শতাংশের সমান। বিশ্বব্যাপী
দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ চাহিদা ব্যাপকভাবে কমে আসায় বাণিজ্য, সরবরাহ ব্যবস্থা, ভ্রমণ, পর্যটন, শিল্প উৎপাদনে বাধা
তৈরির প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য
ক্ষতির ধারণাগত এই হিসাব দিয়েছে এডিবি।
খবর বিভাগঃ
জাতীয়

0 facebook: