আন্তর্জাতীক ডস্ক।। দিল্লীর সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় ৪০ জনের বেশি নিহত হচ্ছিল, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের
সম্পত্তি ধ্বংস ও লুণ্ঠিত
হচ্ছিল, তখন উগ্রহিন্দুত্ববাদী ভারতের টিভি নিউজ চ্যানেলগুলো যে বিষ
ছড়ানোর ভূমিকা পালন
করেছিল, তা
বিস্তারিতভাবে আলোচনাযোগ্য।
উগ্রহিন্দুত্ববাদী ভারত
সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ভারতে টিভি নিউজ চ্যানেলের সংখ্যা ৪০৩টি।
সার্বক্ষণিক চলমান এসব চ্যানেলের
অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত
বিষয় হচ্ছে স্পর্শকাতর ‘ব্রেকিং
ও এক্সক্লুসিভ নিউজ’ দিয়ে
তাদের পর্দাকে উত্তেজনাকর রাখা।
উগ্রহিন্দুত্ববাদী বিজেপি-নেতৃত্বাধীন
সরকারের গণবিরোধী এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে রটওয়েলার জাতের কুকুরে পরিণত হওয়া উগ্রহিন্দুত্ববাদী ভারতীয় টিভি নিউজ মিডিয়া সহিংসতায় ইন্ধন দেয়া, মুসলিমদের বিরুদ্ধে
হিন্দুদের ক্ষেপিয়ে তোলা,
মুসলিমদের
শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভও
সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনসাধারণ ও ভারতের অখণ্ডতার প্রতি হুমকি হিসেবে প্রদর্শন করার
নতুন ভূমিকায় দায়িত্ব পালনকে নিজের কাঁধে গ্রহণ করে নিয়েছে। এরা মুসলিম ও তাদের সহানুভূতিশীলদেরকে ‘টুকরে টুকরে গ্যাঙ’ হিসেবে অভিহিত করছে।
‘টুকরে
টুকরে গ্যাঙ’ হলো
ক্ষমতাসীন বিজেপি ও তাদের সহানুভূতিশীলদের অতি ব্যবহৃত অবমাননাকর রাজনৈতিক পরিভাষা। তারা তাদের সমালোচকদেরকে
ভারতকে খণ্ড বিখণ্ড
করার প্রয়াসে লিপ্ত বলে প্রচার করতে চায়।
গত মাসে হিন্দুত্ববাদী পুলিশ
যখন দিল্লীর জামিয়া মিল্লিয়া
ইসলামিয়ার লাইব্রেরিতে ঝাঁপিয়ে
পড়ে ছাত্রদের ওপর লাঠি কিংবা ব্যাটন চার্জ করছিল, তখন পুলিশের
ভূমিকা
নিয়ে প্রশ্ন না তুলে হিন্দুত্ববাদী
টিভি নিউজ চ্যানেলগুলো পুলিশের নৃশংসতাকে বৈধ করতে প্রাণান্তকর চেষ্টা চালায়।
যে সিসিটিভি ফুটেজে লাইব্রেরিতে পুলিশের তাণ্ডব প্রকাশ করে
দিচ্ছিল, তাতে
দেখা যায় যে এক কোণে একটি ছাত্র তার মুখ রুমালে ঢেকে বসে আছে। ফুটেজে দেখা যায়, পুলিশ কিভাবে ছাত্রদের
ওপর ব্যাটন হাতে নির্মমভাবে আক্রমণ
করেছিল।
ফুটেজটি যখন টিভি নিউজ চ্যানেলগুলোতে পৌঁছাল, তখন তারা পুরো
বিষয়টিই
উল্টে দেয়ার চেষ্টা করল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির ঘটনার জন্য পুলিশকে দায়ী করার বদলে
টিভি সাংবাদিকেরা মুখ ঢেকে রাখা ছাত্রটির দিকে আঙুল তুলল।
জি নিউজের অ্যাঙ্কর সুধীর চৌধুরী বলে, নিকাব পরে কে
লাইব্রেরিতে বসে আছে? পুলিশ খারাপ কী করেছে? ক্যাম্পাসে শিক্ষা নয়, অন্য কিছু আমদানি করা হয়েছে। এখানে দেশের
বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র পাকানো হচ্ছে।
সন্ত্রাসী মোদিপন্থী
ও মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষমূলক রিপাবলিক টিভি ও টাইমস নাও মিডিয়া হাউসগুলোও একই
ধরনের বক্তব্য প্রচার করে।
অবশেষে বিবিসি পুরো কাহিনীর কেন্দ্রে থাকা ছাত্রটিকে শনাক্ত
করে। পরে জানা
যায় যে নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করার সময় ক্যাম্পাসে তীব্র টিয়ার গ্যাস ছড়ানো
হয়েছিল, তা
থেকে রক্ষা পেতে অনেক ছাত্র তাদের মুখ ঢেকেছিল।
এর এক দিন পর আরেকটি টিভি নিউজ চ্যানেল ইন্ডিয়া টুডে
লাইব্রেরির ঘটনা নিয়ে
৭১ সেকেন্ডের একটি ভিডিও প্রকাশ করে। তাতে দাবি করা হয় যে তারা পুরো ঘটনার সম্পাদনাহীন ভিডিও
দেখাচ্ছে। চ্যানেলটি এমনকি লাইব্রেরির ভেতরে এক ছাত্রের হাতে পাথর পর্যন্ত দেখানো হয়। পরে দেখা যায়, ছাত্রটি তার ওয়ালেট ধরে ছিল এবং ফুটেজটি ছিল
দ্বিতীয় ফ্লোরের, অথচ
পুলিশের তাণ্ডব ঘটছিল প্রথম
ফ্লোরে।
রিপাবলিক টিভির প্রধান অর্নব গোস্বামী একতরফা রিপোর্টিংয়ের
জন্য পরিচিত। সে শাহিন বাগের বিক্ষোভের বিরুদ্ধে লোকজনকে
ক্ষেপিয়ে তুলতে সবকিছুই
করেছে।
উল্লেখ্য, গত
দুই মাস ধরে শাহিন বাগে শান্তিপূর্ণভাবে সিএএবিরোধী বিক্ষোভ চলছে।
সে প্রতিবাদকে চিহ্নিত করে এভাবে: পুরো
শাহিন বাগের ঘটনা আসলে টাকার
খেলা।
আর তা করা হচ্ছে বিশ্বব্যাপী ভারতকে কলুষিত করার জন্য। শাহিন বাগ হলো ভারতবিরোধী, হিন্দুবিরোধী, টাকা লিপ্সু, সুযোগসন্ধানী ও পুরোপুরি
রাজনৈতিক আন্দোলন।
শাহিন বাগের সহিংস বিক্ষোভ দিল্লিতে লোকজনকে সন্ত্রস্ত্র করে ফেলছে, আর আমরা পুরোপুরি নীরব
থাকব? শাহিন
বাগ থেকেই সবচেয়ে সাম্প্রদায়িকতাপূর্ণ
ও জিন্নাহপন্থী বিবৃতি প্রকাশিত হয়।
প্রাইম টাইমে টিভি নিউজ অ্যাঙ্করেরা এমন ভূমিকা পালন করার পর
ধর্মীয় উন্মাদেরা
যা করার কথা, তাই
করেছে। ২৭ জানুয়ারি বিজেপি নেতা ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর এক নির্বাচনী সমাবেশে সিএএবিরোধী
বিক্ষোভের বিরুদ্ধে প্ররোচনা
সৃষ্টিকারী স্লোগান দেয় ‘গোলি
মারো সা...কো’ (গুলি
মারো বিশ্বাসঘাতকদেরকে)।
কেন্দ্রীয় অর্থ প্রতিমন্ত্রীও একই ধরনের স্লোগান দেয়।
পরের দিন,
২৮
জানুয়ারি উগ্রহিন্দুত্ববাদী
বিজেপি এমপি পরবেশ ভার্মা বলে,
কাশ্মিরে কাশ্মিরি পণ্ডিতদের
প্রতি যা হয়েছে, দিল্লীতে তাই ঘটছে। সে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলে, শাহিন বাগের লাখ লাখ
সিএএবিরোধী বিক্ষোভকারী বাড়ি বাড়ি
ঘুরে
নারীদের হত্যা ও ধর্ষণ করতে পারে।
অবশেষে ২৩ ফেব্রুয়ারি ভারতের রাজধানীতে কিয়ামত নেমে আসে। সাম্প্রদায়িক সঙ্ঘর্ষে এখন পর্যন্ত
নিহত হয়েছে ৪২ জন, আহত
হয়েছে ২০০-এর বেশি। হাজার
হাজার
লোক চাকরিহীন হয়ে পড়েছে,
আশ্রয়
পর্যন্ত নেই।
দিল্লী
মাইনরিটি কমিশনের প্রধান ড. জাফরুল ইসলাম খান বলেন, অনুরাগ
ঠাকুর, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও পরবেশ
ভার্মা সাম্প্রতিক রাজ্য বিধান সভার নির্বাচনের সময় শান্ত ও শান্তিপূর্ণ দিল্লীতে বিষবাস্প ছড়িয়ে দেয়। উগ্রহিন্দুত্ববাদী কপিল মিশ্রের হুমকি ও আলটিমেটাম সহিংসতা ছড়িয়ে দেয়, আর তাতে নিরীহ কয়েক ডজন লোকের প্রাণ যায়, শত শত লোক আহত হয়েছে, নিরীহ লোকদের কোটি কোটি
রুপির সম্পত্তি
ধ্বংস হয়েছে। আবার এসব অপরাধী অবাধে ঘুরে বেড়ালেও যে বিচারপতি তাদের বিরুদ্ধে এফআইআর
দায়ের করার নির্দেশ জারি করেছিল,
তাকে
তাৎক্ষণিক দিল্লি
থেকে বদলি করা হয়েছে।
আর যখন পরিস্থিতি শান্ত হবে, তখন টিভি নিউজ চ্যানেলগুলো কি অনৈক্যের বীজ বপণ আর বিভেদ রেখা
সৃষ্টির পথেই ধরবে? টিভি
অ্যাঙ্করদের (যেমনটা করেছে
ইন্ডিয়া
টুডের সাংবাদিকেরা) প্রিয় বিষয় যতক্ষণ নির্মম মুসলিমবিরোধী বাগাড়ম্বড়তা থাকবে, তত দিন মুসলিমদের মাথার
ওপর খগড় ঝুলতেই থাকবে, এবং
তা নানাভাবে
দেশের জন্য বিপর্যয়করই প্রমাণিত হবে।
একদিন হয়তো দেশের জনগণ ভাবতে বসবে আসল ‘টুকরে টুকরে গ্যাঙ’ কারা?
‘টুকরে
টুকরে গ্যাঙ’ হলো ক্ষমতাসীন
বিজেপি ও তাদের সহানুভূতিশীলদের অতি ব্যবহৃত অবমাননাকর রাজনৈতিক পরিভাষা।
তারা তাদের সমালোচকদেরকে ভারতকে খণ্ড বিখণ্ড করার প্রয়াসে লিপ্ত বলে প্রচার
করতে চায়।
সূত্রঃ এসএএম
খবর বিভাগঃ
আন্তর্জাতিক
ভারত
মুসলিম নির্যাতন

0 facebook: