![]() |
২০০৭
সালে সংবিধান স্থগিতের দায়ে মোশাররফের বিচারের জন্য গঠিত বিশেষ আদালতের নেতৃত্বদানকারী
পেশোয়ার হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ওয়াকার আহমেদ শেঠকে মানসিকভাবে অসুস্থ বলে তাকে
অপসারণের জন্য আবেদন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইমরানের সরকার, এমনটাই
জানিয়েছেন পাক আইনমন্ত্রী ফারুগ নাশিম।
মঙ্গলবারের
রায়ের পর গত বৃহস্পতিবার ১৬৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি প্রকাশিত হওয়ার হলে দেখা
গেছে, আদালত
তার রায়ে দুবাইয়ে অবস্থানরত পারভেজ মোশাররফ যদি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগেই মারা যান
তাহলে তার মরদেহ পার্লামেন্টের সামনে এক স্থানে তিনদিন ঝুলিয়ে রাখার আদেশ দিয়েছে।
রায়ে
বলা হচ্ছে, আইন
প্রণয়নকারী সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দিচ্ছি পলাতক দোষী ব্যক্তিকে গ্রেফতারের জন্য সবরকম
চেষ্টা চালাতে হবে। কিন্তু সাজা কার্যকরের আগেই যদি তার মৃত্যু হয়, তাহলে
ইসলামাবাদের ডি-চকে তার মরদেহ নিয়ে সেখানে তিনদিন ঝুলিয়ে রাখতে হবে।
ডি-চক
বা ডেমোক্র্যাসি চক নামের ওই জায়গাটি প্রেসিডেন্টের বাসভবন, প্রধানমন্ত্রীর
কার্যালয়, পার্লামেন্ট
ও সুপ্রিম কোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনের পাশেই অবস্থিত। এদিকে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ
পাওয়ার পরপরই প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এক জরুরি বৈঠক করেন। পরে এক সংবাদ সম্মেলনে বৈঠকে
নেয়া সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
আইনমন্ত্রী
ফারুগ নাশিম বলেন, এই
বিচার এটাই প্রমাণ করে যে বিচারক শেঠ মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন, কেননা
তিনি বলেছেন, মোশাররফ
যদি মৃত্যুদণ্ডের আগেই মারা যান তাহলে তার মরদেহ ঝুলিয়ে রাখতে হবে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড
পাকিস্তানের আইনেরও বিরোধী বলে তিনি দাবি করেন।
ইমরানের
মন্ত্রিসভার এই সদস্য বলেন,
কেন্দ্রীয় সরকার মামলাটি নিয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে যাওয়ার
সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কারণ
সরকার বিশ্বাস করে হাইকোর্ট কিংবা সুপ্রিম কোর্ট একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে এমন বিচার
করতে পারে না। যদি কোনো বিচারক এই রায় দেন তাহলে তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ এবং বিচারের
অযোগ্য।
পাকিস্তানে
সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলই বিচার বিভাগের একমাত্র আইনি অঙ্গ-প্রতিষ্ঠান, যা হাইকোর্ট
কিংবা সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে। নাশিম বলেছেন, সরকার
সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে বিচারপতি শেঠকে তার বিচারিক ক্ষমতা থেকে অপাসরণ
করার আর্জি জানাবে।
প্রধানমন্ত্রী
ইমরানের উপদেষ্টা শেহজাদ আকবর বলেন,
যে বিচার হয়েছে তা সবদিক থেকে আইনের নিয়ম বহির্ভূত। সুপ্রিম জুডিশিয়াল
কাউন্সিলে সরকার শুধু বিচারক শেঠকে অপসারণের আবেদনই জানাবে না সরকার একই সঙ্গে পারভেজ
মোশাররফের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আদালতে আপিলও করবে।
এর আগে
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র মেজর জেনারেল আসিফ গফুর বলেন, অবসরপ্রাপ্ত
জেনারেল পারভেজ মোশাররফের বিরুদ্ধে দেয়া রায়ের বিস্তারিত নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ইমরান
খানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া। যেখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ
সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রদ্রোহের
দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফকে দেয়া মৃত্যুদণ্ডের
রায়কে অন্যায্য অভিহিত করে ইমরান খান সরকার। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, পারভেজ
মোশাররফকে দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে তার পক্ষ নেবে সরকার।
তার আগে
পারভেজ মোশাররফকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার ঘটনাকে সশস্ত্র বাহিনীর পদমর্যাদার জন্য বিরাট এক
বেদনা ও প্রচন্ড কষ্টকর ব্যাপার অভিহিত করে তা মেনে নেয়া হবে না হুমকি দিয়ে দেশটির
শক্তিশালী সেনাবাহিনী বলে,
যিনি ৪০ বছর দেশের সেবা করেছেন, দেশের হয়ে যুদ্ধে লড়েছেন, তিনি
কোনোভাবেই দেশদ্রোহী হতে পারেন না।
বিবৃতিতে
আদালতের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলে সেনাবাহিনী বলে, বিশেষ আদালত গঠন, আত্মরক্ষার
মৌলিক অধিকারকে অস্বীকার,
স্বতন্ত্র সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম গ্রহণ করা ও তাড়াহুড়ো মামলা শেষ
করাসহ তার (পারভেজ মোশাররফ) বিচারের ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া উপেক্ষা করা হয়েছে
বলে মনে হচ্ছে।
পাঞ্জাব
প্রদেশের শহর রাওয়ালপিন্ডিতে অবস্থিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদর দফতের ঊর্ধ্বতন সামরিক
কর্মকর্তারা এক বৈঠকে মিলিত হওয়ার পর বিবৃতিটি দেয়া হয়। আদালত পারভেজ মোশাররফের মৃত্যুদণ্ডের
রায় দেয়ার পরপরই সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জরুরি বৈঠকে বসে এমন বিবৃতি দেয়ার
সিদ্ধান্ত নেন।
বিবৃতিতে
আরও বলা হয়, সশস্ত্র
বাহিনী প্রত্যাশা করে যে,
ইসলামিক প্রজাতন্ত্রী পাকিস্তানের সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে
ন্যায়বিচার করা হবে।
বহুল কথিত পাকিস্তানের সেনা সমর্থিত সরকারের
জন্য সামরিক বাহিনীর এমন বিবৃতিকে হুমকি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
প্রসঙ্গত, পাকিস্তানের
একটি বিশেষ আদালত দীর্ঘ যুক্তিতর্কের ওপর শুনানি শেষে গত মঙ্গলবার যুগান্তকারী এই রায়
দেয়। ২০০৭ সালের ৩ নভেম্বর অবৈধভাবে সংবিধান
স্থগিত করে জরুরি অবস্থা জারি করায় রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে পারভেজ
মোশাররফকে এই সাজা দেয়া হলো।
পারভেজ মোশাররফ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ১৯৯৯ সালে ক্ষমতা
দখল করেন। ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত দেশটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ২০০৭ সালের নভেম্বরে
সংবিধান স্থগিত করে জরুরি অবস্থা জারি করার পর তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হলে অভিশংসনের
ঝুঁকি থেকে বাঁচতে ২০০৮ সালে পদত্যাগ করেন তিনি।
খবর বিভাগঃ
আন্তর্জাতিক
পাকিস্তান

0 facebook: