আন্তর্জাতীক ডেস্ক।। ১৯৫৪
সালের আগস্টে একদল শ্বেতাঙ্গ তরুণ
পরিকল্পিতভাবে
লন্ডনের নটিং হিলে কালোদের ওপর লোহার রড, গোশত কাটার ছুরি আর দুধের বোতল নিয়ে হামলা করছিল। এক পুলিশ সদস্য জানিয়েছিলেন যে ৩০০
লোকের ওই দাঙ্গাবাজেরা
স্লোগান দিচ্ছিল, ‘আমরা
কৃষ্ণাঙ্গ কুত্তাদের খতম করছি।
তাদেরকে
তোমরা কেন দেশে ফেরত পাঠাচ্ছ না?’
এক
সপ্তাহ ধরে ওই হামলা চলে। ওই
ঘটনা
এখনো ‘নটিং
হিল রায়ট’ নামে
উল্লেখ করা হয়। বিষয়টি তেমন ছিল না। এটি ছিল সপ্তাহব্যাপী চলা বর্ণবাদী হামলা। ওল্ড বেইলিতে ৯ শ্বেতাঙ্গ
তরুণকে সাজাদানকারী
বিচারপতি স্যালমন এটিকে ‘কৃষ্ণাঙ্গ
বধ’ হিসেবে
অভিহিত করেছিলেন।
বর্ণবাদী সহিংসতাকে ‘দাঙ্গা’
হিসেবে
অভিহিত করার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।
এটিকে
টার্গেট করা হামলা হিসেবে পরিচিতি না দিয়ে সাধারণ সহিংসতামূলক হাঙ্গামা হিসেবে চালিয়ে দেয়ার
প্রয়াস থেকে এই চেষ্টা। গত সপ্তাহে উগ্রহিন্দুত্ববাদী
ভারতীয় রাজধানী দিল্লির কিছু অংশে
ছড়িয়ে পড়া সহিংসতার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদেরা একে ‘দাঙ্গা’ হিসেব অভিহিত করছেন। ব্যাপারটি
নটিং হিলের কৃষ্ণাঙ্গদের উপর চালানো আক্রমণকে ‘দাঙ্গা’
হিসাবে
বর্ণনা করার মতোই। গত সপ্তাহে দিল্লী যা দেখেছে, তা হল সেই ‘নিগ্রো শিকার’ এর সমতুল্য, যা মুসলমানদের বিরুদ্ধে উগ্রহিন্দু জাতীয়তাবাদীরা চালিয়েছে। তাদের বেশিরভাগই ছিল প্রধানত উগ্রহিন্দুত্ববাদী ভারতের শাসকদল বিজেপি’র সমর্থক। অনেকেই ‘জয় শ্রী রাম’ এবং ‘হিন্দুয়ান কা হিন্দুস্তান’ (হিন্দুদের জন্য ভারত) বলে
স্লোগান দিয়ে মুসলিমদের ওপর টার্গেট করে সহিংসতা চালিয়েছিল।
এই সহিংসতা শুরু হয় স্থানীয় বিজেপি রাজনীতিবিদ কপিল মিশ্রের একটি সমাবেশে বক্তৃতা করার পর।
সে বলেছিল, ‘পুলিশ যদি নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) বিরোধিতা করে
রাজপথে অবস্থান গ্রহণকারীদের সরিয়ে না দেয়, তবে
সে ও তার
সমর্থকেরা তা করবে।’ সিএএ
নতুন একটি আইন। এতে প্রধানত
প্রতিবেশী
দেশগুলোর অমুসলিমদেরকে নাগরিকত্ব প্রদানের কথা বলা হয়েছে। ভারত স্বাধীনতা লাভ করার পর এটিই
মুসলিমদেরকে বাইরে রাখার প্রথম আইন,
এর বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ
চলছে। কপিল মিশ্রের আল্টিমেটাম প্রদান করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিজেপি গ্যাঙগুলো সিএএবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা
চালাতে শুরু
করে। কয়েক দিনের মধ্যে তারা মুসলিমদের বাড়িঘর, দোকানপাট ও মসজিদ জ্বালিয়ে দেয়। অন্তত ৪৬ জন নিহত হয়েছে।
এর ফলে অনেকে
দিল্লির
ঘটনাপ্রবাহকে সাধারণ বিশৃঙ্খলা এবং এমনকি প্রধানত মুসলিম সহিংসতা হিসেবেও চিত্রিত করছে। ১৯৫৮
সালে ‘কালো’দের অনেকে ইট ও ব্যাট হাতে
প্রস্তুত হয়েছিল, কেউ কেউ শ্বেতাঙ্গদের ওপর
হামলা করার জন্য সঙ্ঘবদ্ধও হয়েছিল।
কিন্তু
সেটি স্থানীয় কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর বর্ণবাদী হামলার বিষয়টিকে আড়াল করেনি। দিল্লিতেও দেখা গেছে, হিন্দু উগ্রবাদী ও মুসলিমবিরোধী
বৈরিতা প্রতিরোধ
করতেই মুসলিমেরা সহিংসতা দিয়ে জবাব দিয়েছিল।
বিজেপি ‘হিন্দুত্ববাদী’ মতাদর্শে পরিচালিত দল। তারা
ভারতের জন্য একমাত্র নির্ভরযোগ্য
জীবনযাত্রার পথ হিসেবে হিন্দুত্বকে চায়। গত মাসে বিজেপি সরকারের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী
গিরিরাজ সিং বলেছিল, সব ভারতীয়
মুসলমানের উচিত ছিল দেশ
ভাগের সময় পাকিস্তানে চলে যাওয়া। ইউরোপের অনেক প্রতিক্রিয়াশীল গ্রুপের মতো বিজেপিও মূলধারার
রাজনৈতিক দলগুলোর, বিশেষ
করে কংগ্রেসের (স্বাধীনতার
পর থেকে এই দলটিই বেশির ভাগ সময় শাসন করেছে) ব্যর্থতা ও দুর্নীতিতে অসন্তুষ্ট হওয়ার
কারণেই মূলত উগ্রহিন্দুত্ববাদী বিজেপি
জনসাধারণের সমর্থন লাভ করেছে।
২০১৪ সালে বিজেপি যখন ক্ষমতায় আসে,
তখন
এর হিন্দু উগ্রবাদ নিয়ন্ত্রণে
রেখেছিল। আর গত বছরের নির্বাচনে বিপুল বিজয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে কোনো সংযম
ছাড়াই বিশেষ নীতি বাস্তবায়নে লাইসেন্স দিয়ে দিয়েছে।
২০১৯ সালের আগস্টে সরকার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জম্মু ও কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন মর্যাদা বাতিল
করে এবং স্থানীয় বিক্ষোভ নৃশংসভাবে দমন করে। তারপর আসে ‘সিএএ’ ও ‘এনআরসি’। এটি মুসলিমদের নাগরিকত্ব
নিয়ে দ্বিমুখী আক্রমণ।
ভারতীয় মুসলিমরা আশঙ্কা করছে যে কয়েক প্রজন্ম ধরে ভারতে বসবাস করে এলেও তাদেরকে ‘বিদেশী’ ঘোষণা করা হবে, তারা হয়ে পড়তে পারে ভারতীয়
রোহিঙ্গা। এই লড়াইতে
কে জয়ী হবে তা
কেবল মুসলিমদের বা ভারতীয়দের জন্যই নয়, বরং আমাদের সবার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান।
খবর বিভাগঃ
আন্তর্জাতিক

0 facebook: