![]() |
স্টাফ রিপোর্ট।। নরসিংদী
জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক পাপিয়া চৌধুরী ও তার স্বামী মফিজুর রহমান চৌধুরী সুমন ওরফে মতি সুমন
এখন ‘টক
অব দ্য
কান্ট্রি’। ভালো
কোনো কাজের জন্য নয়, অপরাধের
জন্য তারা আলোচনায়। রাজনীতির
আড়ালে অস্ত্র, মাদক
ও দেহব্যবসা করে বিশাল সম্পদের মালিক হয়েছে এই দম্পতি। এ কারণে শনিবার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে
তাদের গ্রেফতার
করেছে র্যাব।
রোববার রাজধানীর ফার্মগেটে ইন্দিরা রোডে তাদের বাসায় অভিযান
চালিয়ে ১টি বিদেশি
পিস্তল, ২টি
ম্যাগাজিন, ২০ রাউন্ড
গুলি, ৫ বোতল
বিদেশি মদ, ৫৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা, ৫টি পাসপোর্ট, ৩টি চেক, বেশকিছু বিদেশি মুদ্রা ও
বিভিন্ন ব্যাংকের
১০টি এটিএম কার্ড উদ্ধার করা হয়।
গ্রেফতারের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয় বাইজি
সর্দারনী বেশে পাপিয়ার
ভিডিও। ইতিমধ্যে তার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কথা বের হতে শুরু করছে। মুখ খুলতে শুরু
করেছেন সাধারণ মানুষ। সন্ত্রাস,
চাঁদাবাজি, পতিতা ব্যবসার পাশাপাশি
ব্ল্যাকমেইল করে পাপিয়া ও তার স্বামী গড়ে তুলেছে সম্পদের পাহাড়। অনৈতিক
কার্যকলাপের ভিডিও ধারণ করে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিত তারা। অপরাধে
জড়িয়ে পড়া যুব মহিলা লীগ নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়াকে ইতিমধ্যে সংগঠন থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে।
রোববার বিকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে
আয়োজিত এক
সংবাদ সম্মেলনে র্যাব-১ অধিনায়ক (সিও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাফী উল্লাহ বুলবুল বলেন, চাকরিপ্রত্যাশী নারীদের
দেহব্যবসায় বাধ্য করত শামীমা নূর
পাপিয়া।
আর অনৈতিক কর্মের ভিডিও ধারণ করে ব্যবসায়ীদের ব্ল্যাকমেইল করত। এ দুই উপায়ে সে শত শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছে। অস্ত্র
ও মাদক মজুদের পাশাপাশি
কিউঅ্যান্ডসি নামে ক্যাডার বাহিনীও গঠন করেছে।
সে জানায়, পুলিশের এসআই ও বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন পদে মানুষকে চাকরি দেয়ার কথা বলে বিপুল
পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে র্যাবের হাতে গ্রেফতার হওয়া পাপিয়া ও তার স্বামী সুমন। শুধু তাই নয়, জমির দালালি, সিএনজি পাম্পের লাইসেন্স দেয়া, গ্যাসলাইন সংযোগের নামেও
সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মোটা
অঙ্কের
অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে তারা। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকে নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ অর্থ
রেখেছে এই দম্পতি।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে জাল টাকা বহন ও অবৈধ
টাকা পাচারের অভিযোগে
শামিমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউসহ চারজনকে গ্রেফতার করে র্যাব। গ্রেফতারকৃত অন্যরা হল- পাপিয়ার
স্বামী মফিজুর রহমান ওরফে সুমন চৌধুরী ওরফে মতি সুমন (৩৮), সাব্বির খন্দকার (২৯) ও শেখ তায়্যিবা (২২)।
লে. কর্নেল শাফী উল্লাহ বুলবুল বলেন, প্রাথমিক তদন্তে
ফার্মগেটে পাপিয়ার দুটি
বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, নরসিংদী
শহরে দুটি ফ্ল্যাট, ২ কোটি
টাকা মূল্যের দুটি
প্লট, চারটি
বিলাসবহুল গাড়ি এবং গাড়ি ব্যবসায় প্রায় দেড় কোটি টাকা বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া
গেছে। এছাড়া বিভিন্ন দেশের ব্যাংকে নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ অর্থ গচ্ছিত
থাকার কথা জানা গেছে।
র্যাবের দাবি,
পাপিয়া
ও তার স্বামী সুমন চৌধুরী রেলওয়ে ও পুলিশে চাকরির প্রলোভনে ১১ লাখ টাকা, একটি কারখানায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেয়ার কথা বলে ৩৫ লাখ টাকা, একটি সিএনজি পাম্পের
লাইসেন্স করে দেয়ার কথা বলে ২৯ লাখ টাকা নিয়েছেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর বাইরে নরসিংদী এলাকায়
চাঁদাবাজি, মাদক
ও অস্ত্র
ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করেছে তারা।
র্যাব-১ এর অধিনায়ক বলেন, পাপিয়ার আয়ের অন্যতম উৎস নারীদের দিয়ে জোরপূর্বক অনৈতিক কাজ
করানো। ঢাকার বিভিন্ন বিলাসবহুল হোটেলে কম বয়সী মেয়েদের অনৈতিক কাজে বাধ্য করত সে। যাদের অধিকাংশকে নরসিংদী এলাকা থেকে চাকরির প্রলোভনে ঢাকায়
আনা হয়েছিল। অনৈতিক কাজে বাধ্য না হলে তাদের নানাভাবে নির্যাতন করা হতো।
পাপিয়ার সঙ্গে বিশিষ্টজনদের ছবির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্তমানে যদি কেউ কারও সঙ্গে ছবি
তুলতে চায় তাহলে বিষয়টি সাধারণত এড়ানো যায় না। তাই কারও সঙ্গে ছবি থাকা মানেই সখ্য নয়।
এদিকে পাপিয়া ও তার স্বামীসহ গ্রেফতারকৃতদের বিমানবন্দর থানায়
হস্তান্তর করেছে
র্যাব। তাদের আজ আদালতে তোলা হবে। তাদের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা হবে। এর মধ্যে বিশেষ ক্ষমতা
আইনে একটি মামলা দায়ের হয়েছে। বাকি দুটি মামলা অন্যান্য থানায় হবে।
র্যাব জানায়,
যুবলীগ
নেত্রী পাপিয়া পিউ নামেই বেশি পরিচিত। এই নেত্রীর প্রকাশ্য আয়ের উৎস গাড়ি বিক্রি ও সার্ভিসিংয়ের ব্যবসা। এর
আড়ালে জাল মুদ্রা সরবরাহ, বিদেশে অর্থপাচার এবং
অবৈধ অস্ত্র রাখাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এসব অভিযোগের অনুসন্ধান
করছিল র্যাবের একটি
দল। বিষয়টি আঁচ করতে পেরে শনিবার সকালে তড়িঘড়ি করে দেশত্যাগের চেষ্টা করে পাপিয়া। তবে শেষ
রক্ষা হয়নি। সহযোগীসহ গ্রেফতার হয় সে।
র্যাব কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাফীউল্লাহ বুলবুল বলেন, গাড়ির ব্যবসার আড়ালে সে অবৈধ অস্ত্র, মাদক ব্যবসা ও
চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অনৈতিক
কর্মকাণ্ডের
সঙ্গে যুক্ত। সমাজসেবার নামে তিনি নরসিংদীর অসহায় নারীদের অনৈতিক কাজে লিপ্ত করে
আসছিল। সে গুলশানের একটি অভিজাত হোটেলের প্রেসিডেন্ট স্যুট নিজের
নামে বুক করে নানা ধরনের অসামাজিক কার্যকলাপ চালিয়ে আসছিল।
র্যাব জানায়,
পাপিয়ার
স্বামীর থাইল্যান্ডে বারের ব্যবসা রয়েছে। সে দীর্ঘদিন
ধরে অবৈধ অস্ত্র-মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।
তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা বিচারাধীন। সে স্ত্রীর
মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসহায় নারীদের অনৈতিক কাজে ব্যবহার করে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০০০ সালের দিকে নরসিংদী শহর ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক মফিজুর রহমান
চৌধুরী সুমনের উত্থান শুরু। শৈশব থেকেই চাঁদাবাজি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও ব্ল্যাকমেইল ছিল সুমনের প্রধান পেশা। চতুর
সুমন রাজনীতিবিদদের
সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে। ২০০১ সালে পৌরসভার কমিশনার মানিক মিয়াকে যাত্রা
প্যান্ডেলে গিয়ে হত্যার পর সে
আলোচনায় আসে। এরই মধ্যে
পাপিয়া
চৌধুরীকে বিয়ে করে সে। এরপর
সে স্ত্রী পাপিয়াকে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করায়। ২০১৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর জেলা যুব
মহিলা লীগের সম্মেলনে তৌহিদা
সরকার রুনা সভাপতি ও পাপিয়া চৌধুরী সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়।

0 facebook: